সিজার করতে কত টাকা খরচ হয় বিস্তারিত জানুন

আমরা অনেকে জানিনা সিজার করতে কত খরচ হয়। আপনি কি সিজার করতে কত টাকা লাগে বা কত টাকা খরচ হয় সে সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন? তাহলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য। এই আর্টিকেলটি পড়লে সিজার করতে কত খরচ হয় সে সম্পর্কে আপনি জানতে পারবেন।
এই আর্টিকেলটি পড়লে সিজার করতে কত সময় লাগে, সিজারের খরচ, সিজারের কদিন পর বাচ্চা নেওয়া যায় ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। তাই আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

ভূমিকা

বর্তমানে যত বাচ্চা ডেলিভারি তার বেশিরভাগ বাচ্চায় সিজার এর মাধ্যমে হয়। তারপরও অনেকে আছে সিজার করাতে ভয় পান। অনেকে ভাবেন সিজার করাতে অনেক টাকা খরচ হয়। আবার অনেকে ভাবেন সিজার করালে বাচ্চা এবং মা দুজনের ঝুকি থাকে। তবে সিজার করালে বাচ্চা এবং মা দুজনের ঝুকির পরিমাণ কমে এ সম্পর্কে অনেকে ধারণা রাখে না। এই আর্টিকেলটিতে সিজার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া আছে। চলুন সিজার সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।

সিজার করতে কত টাকা খরচ হয়

বাংলাদেশের স্থান এবং হাসপাতাল এর ওপর সিজার খরচ নির্ভর করে। সরকারি হাসপাতাল গুলোতে সিজার খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি এবং প্রাইভেট হাসপাতাল গুলোতে সিজার খরচ অনেক বেশি। ঢাকার হাসপাতাল গুলোর থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে হাসপাতাল গুলোতে সিজার খরচ তুলনামূলক অনেক কম। সিজার করতে কত খরচ হয় সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলোঃ

ঢাকার মধ্যে সিজার করতে কত টাকা খরচ হয়

১। স্বল্প খরচের বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে সিজার করা হয়।
 
২। মাঝারি মানের যে বেসরকারি ক্লিনিক গুলো রয়েছে এগুলোতে সিজার প্রতি ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার মতো নেয়া হয়ে থাকে।

৩। ঢাকার মধ্যে উচ্চমানের যেসব হাসপাতাল রয়েছে সেগুলো হলোঃ এভার কেয়ার, স্কোয়ার, ইউনাইটেড হাসপাতাল ইত্যাদি। এসব হাসপাতালে সিজার খরচ তুলনামূলক বেশি। ঢাকা এসব হাসপাতালগুলোতে সিজার করতে ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকার বেশি পর্যন্ত লাগতে পারে।

বিভাগীয় পর্যায়ে সিজার করতে কত টাকা খরচ হয়

১। বিভাগীয় পর্যায়ের স্বল্প খরচের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে সিজার করা হয়।

২। বিভাগীয় পর্যায়ে মাঝারি মানের যে সব বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে এগুলোতে সিজার করাতে ৩৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মত লাগে।
 
৩। বিভাগীয় পর্যায়ের উচ্চমানের যেসব হাসপাতাল রয়েছে এগুলোতে সিজার করাতে প্রায় ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে।

সিজারের খরচ মূলত সার্জন ফ্রি, হাসপাতালের ধরন, কেবিন বা ওয়ার্ডের ধরন, সিজারের সময় বা পরে জটিলতা, ওষুধপত্র এবং রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে। তাই এগুলোর কারণে সিজারের খরচের তারতম্য হয়। তাই সব ক্ষেত্রে সিজার এর খরচ এক নাও হতে পারে।

সিজার করতে কত সময় লাগে

সিজার করতেই সাধারণত ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘন্টার মত সময় লাগে। তবে কোনো জটিলতা থাকলে সময় কিছুটা বেশিও লাগতে পারে। সিজারে বাচ্চার জন্ম হতে বেশি সময় লাগে না তবে পেটের চামড়া সেলাই করতে একটু বেশি সময় লাগে। সিজার করতে কত সময় লাগে সে সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

১। সিজার করা হলে সাধারণত অপারেশন শুরু হওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে বাচ্চার জন্ম হয়।

২। সিজারে সব থেকে বেশি সময় ব্যয় হয় ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে এবং পেটের চামড়া সেলাই করতে। এক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মত সময় লেগে থাকে। ডাক্তার খুব যত্নের সাথে কাজটি করেন এজন্যই সময় একটু বেশি লাগে।

৩। আগে কোন সিজার করা থাকলে বা অন্য কোন শারীরিক জটিলতা থাকলে সিজার করতে একটু বেশি সময় লাগে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোমরের নিচ থেকে অবশ করে এ অপারেশন টি অর্থাৎ সিজার করা হয়। এক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগে। এক্ষেত্রে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ ডাক্তার যত্নের সাথে কাজ করবে সময় তত বেশি লাগবে এটাই স্বাভাবিক।

সরকারি হাসপাতালে সিজারের খরচ

সরকারি হাসপাতাল গুলোতে সিজার খরচ তুলনামুলক অনেক কম। তবে ঔষধ এবং আনুষঙ্গিক খরচ গুলো বেশি হয়। সরকারি হাসপাতাল গুলোতে সিজার করতে ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মত খরচ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যেও সিজার করা হয়। তবে এক্ষেত্রে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা, ব্লাড ক্রস ম্যাচিং এবং আনুষঙ্গিক খরচের জন্য সিজার খরচ ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।

ওপারে যে খরচ গুলোর কথা বলা হলো এ খরচ গুলো তখনই কার্যকর হবে যখন সিজার সাধারণ ওয়ার্ডে করা হবে। যদি কেউ সিজারের জন্য কেবিন ভাড়া নেই সে ক্ষেত্রে খরচ তুলনামূলক বেড়ে যাবে। আবার এই খরচ গুলো বিভাগ পর্যায়ে বা জেলা সদর পর্যায়ে গেলে তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে সরকারি হাসপাতাল গুলোতে সিজার খরচের খুব একটা তারতম্য হয় না। গড়ে সরকারি হাসপাতাল গুলোতে সিজার খরচ ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ধরা হয়।

সিজারে কয়টা বাচ্চা নেওয়া যায়

সিজারে বাচ্চা নেওয়ার নির্দিষ্ট কোন ধরাবাধা নিয়ম নেই। তবে সিজারে তিনটির বেশি বাচ্চা নেওয়া উচিত নয়। সবচেয়ে ভালো হয় দুইটি বাচ্চা নিলে, এতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে। সিজারে তিনটির বেশি বাচ্চা না কেন সে সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

১। প্রতিবার সিজারের পর জরায়ুর পর্দাটি পাতলা হয়ে যায়। ফলে তিনটের বেশি বাচ্চা নিতে গেলে জরায়ুর পর্দা ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তিনটির বেশি বাচ্চা নেওয়া উচিত নয়।

২। গর্ভ ফুল জরায়ুর নিচের দিকে থাকে। সিজারে যখন তিনটি বেশি বাচ্চা নেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে গর্ভ ফুল জরায়ুর দেয়ালের ভেতরের দিকে ঢুকে যায় এবং মারাত্মক ঝকির মধ্যে পড়তে পারে।

৩। প্রতিটি সিজারের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঝুঁকি বাড়ে এবং রক্ত দেওয়া বা জরায়ু কেটে ফেলার মত বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সিজারে বাচ্চা নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনটির বেশি বাচ্চা নেওয়া উচিত নয়।

২য় সিজারের কতদিন পর বাচ্চা নেওয়া যায়

ডাক্তারদের মতে দ্বিতীয় সিজারের পর বাচ্চা নেওয়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১.৫ বছর থেকে ২ বছর ব্যবধান রাখা উচিত। তবে বাচ্চা নেওয়ার ক্ষেত্রে ৩ বছর ব্যবধান দেওয়া সবচেয়ে উত্তম। এতে বিভিন্ন ধরনের ঝকির পরিমাণ তুলনামূলক কমে যায়। দ্বিতীয় সিজারের পর ৩ বছর ব্যবধানে কেন বাচ্চা নেওয়া উচিত সে সম্পর্কে নিশ্চয় বিস্তারিত দেওয়া হলো।

১। সিজারে বাচ্চা হওয়ার পর ক্ষতস্থান শুকোতে অনেক সময় লাগে। এই সময় জরায়ুর পর্দা পাতলা থাকে তাই বাচ্চা নেওয়া ঝুকিপূর্ণ। তাই বাচ্চা নেওয়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে তিন বছরের ব্যবধান রাখা উচিত।

২। ছেলে বাচ্চা হওয়ার পর রক্তশূন্যতা এবং পুষ্টির অভাব হয়। তাই এই পুষ্টি ঘাটতি পূরণ করতে বাচ্চা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবধান রাখা দরকার।

৩। বাচ্চারা ও ক্ষেত্রে ব্যবহার না রাখলে আগের বাচ্চার যত্নের ঘাটতি হয়। তাই বাচ্চা নেওয়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে তিন বছরের ব্যবধান রাখা প্রয়োজন।

সিজারের কত দিন পর সহবাস করা যাবে

চিকিৎসকদের মতে সিজার করার ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ সহবাস করা উচিত নয়। কারণ সিজারের ক্ষতস্থান শুকাতে সময় লাগে এবং জরায়ুর ভিতরে যে ক্ষত সৃষ্টি হয় সেটি সেরে উঠতে কিছুটা সময় লাগে। তাই ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ পর সহবাস করলে জরায়ুতে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আবার সিজার করার ফলে যে সেলাই থাকে এই সেলাইটি শুকাতেও সময়ের প্রয়োজন। তাই যদি তাড়াতাড়ি সহবাস করা হয় সে ক্ষেত্রে সেলাই করা স্থানে ব্যথা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং পরবর্তীতে তা জটিল সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

সিজারের কতদিন পর সেলাই শুকায়

সিজার করার পর বাইরের সেলাই শুকাতে খুব বেশি সময় না লাগলেও পেটের ভেতরের অংশ জোড়া লাগতে বেশ কিছু সপ্তাহ সময় লাগে। সিজারের পর বাইরের সেলাই শুকাতে ৮ থেকে ১০ দিনের মতো সময় লাগে। তবে পেটের ভেতরের টিস্যুগুলো এবং পেশিগুলো পুরোপুরি জোড়া রাখতে প্রায় ৭ থেকে ৮ সপ্তাহের মতো সময় লাগে। সিজারের পরবর্তী সময়ে সেলাই শুকানোর জন্য কিছু টিপস নিতে দেওয়া হলো।

১। সেলাইয়ের জায়গাটি সবসময় পরিষ্কার রাখুন এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।

২। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার এবং ভিটামিন সি জাতীয় খাবার বেশি বেশি খাবার চেষ্টা করুন। যেমনঃ মাছ, মাংস, ডিম, লেবু, কমলা ইত্যাদি। এই খাবারগুলো দ্রুত ক্ষত শুকাতে সাহায্য করে।

৩। ক্ষতস্থানে অর্থাৎ সেলাই করা স্থানে যাতে ঘর্ষণ না লাগে সেজন্য ঢিলাঢালা পোশাক পরিধান করতে হবে।

সিজার করলে কি কি সমস্যা হয়

বর্তমানে বেশিরভাগ বাচ্চাই সিজারের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এতে ঝুঁকি কিছুটা কম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা হয়ে থাকে। চলুন সিজার করলে কি কি সমস্যা হয় সে নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করি।

সিজারের পর মায়ের সমস্যা

১। সিজার করা স্থানে ইনফেকশন হতে পারে এবং জরায়ুতে রক্তক্ষরণ জনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

২। সিজার করার সময় যেহেতু কোমরে অবশ করার ইনজেকশন দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পিঠ এবং মাথাব্যথা হয়ে থাকে।

৩। সিজার করার ফলে মায়েদের পায়ে এবং ফুসফুসে রক্ত জমাট বাধার মত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

৪। সিজারের ফলে পরবর্তী গর্ভধারণে জরায়ুর সেলাই ফেটে যাওয়া অথবা ফুল নিতে থাকার মত সমস্যা হতে পারে।

সিজারের পর বাচ্চার সমস্যা

১। সিজারে জন্ম নেওয়ার শিশুর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শ্বাসকষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং পরবর্তীতে হাঁপানি বা এলার্জির মত সমস্যা হয়ে থাকে।

২। স্বাভাবিক প্রসাবে জন্মানো শিশুর তুলনায় সিজারের শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়।

সিজারের পর পেটে ব্যথা কতদিন থাকে

সিজার করা স্থানে মায়েদের ১ থেকে ২ সপ্তাহ তীব্র ব্যথা থাকে। তবে ব্যথা পুরোপুরি সেরে উঠতে ৬ সপ্তাহ এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে দেড় মাসও লাগতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেড় মাস পরেও মাঝেমধ্যে চিন চিন ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথাটি কয়েক মাস হতে পারে এমনও কি কোন কোন ক্ষেত্রে এই ব্যথা সেরে উঠতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ভারী কাজ থেকে দূরে থাকা এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার খেলে ব্যথাটি দ্রুত সেরে যায়। তবে কোনো কারণবশত যদি ব্যথা তীব্র হয় এবং ব্যাথা থেকে জ্বর আসে অথবা সেলাই ফুলে যায় বা পুঁজ জমে যাওয়ার মত সমস্যা দেখা দেয় তাহলে অবশ্যই দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মন্তব্য

বর্তমানে সিজারে বাচ্চার হওয়া স্বাভাবিক বিষয় মনে হলেও আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। উপরে সিজারের জটিলতা, খরচ, সুবিধা ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। এ তথ্যগুলো গবেষণার ভিত্তিতে লেখ, তাই কোন কোন ক্ষেত্রে তথ্যের তারতম্য হতে পারে। তবে যতটা সম্ভব নির্ভুল তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আশা করি আপনি আর্টিকেলটি পড়ে উপকৃত হয়েছেন। সিজার সম্পর্কিত আপনার অন্য কোন তথ্য জানার থাকলে আমাদের প্রশ্ন করতে পারেন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url