ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

আপনি কি ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন? এই আর্টিকেলটিতে ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত লিখা আছে। যেকোনো বয়সের মানুষের ক্ষেত্রেই ডায়রিয়া রোগটি হতে পারে। তাই ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আমাদের সবার জ্ঞান থাকা উচিত।
এই আর্টিকেলটিতে ডায়রিয়া রোগের জীবাণু্‌, কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার, রোগীর খাবার ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া আছে। আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে আপনি অবশ্যই উপকৃত হবেন।

ভূমিকা

ডায়রিয়া রোগটি সাধারণত দূষিত খাবার অথবা ভাইরাস জনিত কারণে হয়ে থাকে। ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়ার ফলে যে রোগটি চিহ্নিত করা হয় তাকে ডায়রিয়া বলা হয়। ডায়রিয়া হলে সাধারণ জীবন যাপন ব্যাহত হয় এবং শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এই রোগটিকে অবহেলা করা যাবে না। চলুন ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানি।

ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

ডায়রিয়া একটি জীবনবাহিত রোগ। এটি সাধারণত খাবার এবং পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে থাকে। দিনে কমপক্ষে তিনবারের বেশি যদি পাতলা পায়খানা হয় সেক্ষেত্রে এ রোগকে ডায়রিয়া বলে চিহ্নিত করা হয়। ডায়রিয়ার রোগের ঘরোয়া কিছু প্রতিকার রয়েছে। চলুন আমরা ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ এবং ঘরোয়া প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।

ডায়রিয়া রোগের লক্ষন

১। দিনে কমপক্ষে তিনবারের বেশি পাতলা পায়খানা হলে বুঝবেন ডায়রিয়া হয়েছে। কারণ রোগের প্রধান উপসর্গ হচ্ছে ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়া।

২। পেট ব্যথা, পেট মোচড় দেওয়া এবং বমি বমি ভাব হওয়ার এ রোগের অন্যতম লক্ষণ।

৩। হঠাৎ করে তীব্রভাবে জরুরী মলত্যাগের বেগ অথবা মলত্যাগের প্রয়োজন অনুভব হয়।

৪। এই সময় পানি শূন্যতা হয় এবং মুখ শুকিয়ে যায় ও প্রস্রাবের মাত্রা কমে যায়।

৫। অনেক সময় শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং হালকা জ্বর দেখা দেয়।

ডায়রিয়া রোগের ঘরোয়া  প্রতিকার

ডায়রিয়া হলে শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দেয়। এই সময় ঘরোয়া উপায়ে রোগীর সঠিক পরিচর্যা করলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রমও ঘটে। চলুন ঘরোয়া উপায়ে কিভাবে ডায়রিয়ার রোগের প্রতিকার করা যায় সে সম্পর্কে জানি।

১। ডায়রিয়া হলে বেশি বেশি করে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। বিশেষ করে পায়খানার পর অবশ্যই খাবার স্যালাইন অথবা ওআরএস ( ORS ) খাওয়াতে হবে।

২। খাবার হিসেবে তরল খাবার বেশি দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

৩। এ সময় সহজে হজমযোগ্য খাবার যেমন ভাত, কলা, আপেলের সস ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

৪। এ সময় দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

৫। এ সময় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই রোগীর যতটা সম্ভব বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সতর্কতা

যদি তীব্র জ্বর থাকে ও দুই দিনের মধ্যে ডায়রিয়া ভালোবনা হয় এবং রক্ত পায়খানা হয় তবে কাল বিলম্ব না করে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

ডায়রিয়া রোগের জীবাণুর নাম কি

ডায়রিয়া রোগ মূলত নির্দিষ্ট একটি জীবাণুর দ্বারা ছড়ায় না। এটি বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ায়। তবে সবচেয়ে বেশি ডায়রিয়া রোগ যে জীবাণুর দ্বারা ছড়ায় সেটি হচ্ছে রোটাভাইরাস। নিচে ডায়রিয়া রোগের জীবাণু সম্পর্কে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

১। শিশুদের ডায়রিয়া হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে রোটাভাইরাস। এ জীবাণুটি শিশুদের দেহে সংক্রামনের মাধ্যমে ডায়রিয়া ছড়ায়।

২। নোরোভাইরাস সব বয়সের মানুষের মধ্যে ডায়রিয়া ছড়ায় এবং অ্যাডিনোভাইরাস ও অ্যাস্ট্রোভাইরাস ডায়রিয়ার জন্য দায়ী।

৩। ডায়রিয়া বাহিত ব্যাকটেরিয়া দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণ ছড়ায়।

৪। অপরিষ্কার মাটি এবং পানিতে বিভিন্ন ধরনের পরজীবী থাকে, যারা ডায়রিয়া রোগের জন্য দায়ী। এ অপরিষ্কার মাটি এবং পানি সংস্পর্শে আসার কারণে মানুষের ডায়রিয়া রোগ হয়ে থাকে।

ডায়রিয়া রোগের কারণ

ডায়রিয়া এমন একটি রোগ যা নিজেদের অসতর্কতার কারণেই হয়ে থাকে। ডায়রিয়া সাধারণত দূষিত পানি এবং খাবার খাওয়ার ফলে দেহে যে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী প্রবেশ করে তার ফলে হয়ে থাকে। এছাড়াও ফুড পয়জনিং, ঔষধ বা অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণেও ডায়রিয়া হয়ে থাকে। চলুন ডায়রিয়া রোগের কারণগুলোর সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।

১। ডায়রিয়া হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে অপরিষ্কার জীবন যাপন করা। যেমনঃ খাবার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত না ধোয়া অথবা অপরিষ্কার থালাবাসন ব্যবহার করার ফলে ডায়রিয়া রোগ হয়ে থাকে।

২। বিভিন্ন ভারী খাবার, কৃত্তিম মিষ্টি জাতীয় খাবার অথবা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার ফলে অনেকের হজমের সমস্যা হয়। যার ফলে ডায়রিয়া হয়ে থাকে।

৩। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ খাওয়ার ফলে পাকস্থলীর ভালো ব্যাকটেরাগুলো মারা যায়। যার ফলে খাবার হজমে সমস্যা হয় এবং এর থেকে ডায়রিয়া হয়ে থাকে।

৪। পেটে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং বিভিন্ন অনুজীব প্রবেশের ফলে পেটের সমস্যা তৈরি হয়। যার ফলে ডায়রিয়ার রোগটি হয়ে থাকে।

৫। ডায়রিয়া রোগটি হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে দূষিত পানি পান এবং বাসী খাবার খাওয়া। পেটের সংক্রমণ মূলত এর থেকেই শুরু হয়।

ডায়রিয়া রোগের প্রতিরোধ

জীবনযাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন এনে ডায়রিয়া রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ ডায়রিয়া রোগটি মূলত আমাদের নিজেদের কারণেই হয়ে থাকে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণে ডায়রিয়া রোগটি বেশি হয়ে থাকে। এছাড়াও বাইরের অনিরাপদ পানি এবং খোলা অবস্থায় থাকা খাবার অথবা বাসি খাবার খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। তাই একটু সতর্ক জীবন-যাপন করলেই ডায়রিয়া রোগ থেকে বাঁচা যায়। নিচে ডায়রিয়া রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো।

১। নিরাপদ পানি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফিল্টার করা পানি অথবা কম পক্ষে 15 থেকে 20 মিনিট পানি ফোটাতে হবে।

২। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে খাবার খাওয়ার পূর্বে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে।

৩। খাবার সব সময় ঢেকে রাখতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে খাবারের কোনভাবে মশা মাছি পড়তে না পারে। কারণ ডায়রিয়ার জীবাণু সাধারণত মাছের মাধ্যমে বেশি ছড়ায়।

৪। সেনেটারী ল্যাটটিন ব্যবহার করতে হবে এবং বাড়ির আশেপাশে সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কারণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস করলে ডায়রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

৫। শিশুদের ক্ষেত্রে ছয় মাসের পূর্বে মায়ের বুকের দুধ ব্যতীত অন্য কোন খাবার খাওয়ানো উচিত নয়। অন্য খাবার খাওয়ানোর ফলে শিশুদের ডায়রিয়া হতে পারে।

৬। শিশুদের রোটাভাইরাসের টিকা দিতে হবে। যা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া থেকে শিশুদের রক্ষা করবে।

ডায়রিয়া কি বাহিত রোগ

ডায়রিয়া রোগটি সাধারণত দূষিত পানি এবং বাসি খাবারের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। তবে এ রোগটি দূষিত পানির মাধ্যমে বেশি ছড়ায়। রান্নায় ব্যবহৃত পানি এবং খাবার পানিতে অনেক সময় কলেরা বা অন্য পরজীবী থাকতে পারে। যা অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে, ফলে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বাসি খাবার খাওয়ার ফলে পেটে সংক্রমণ হয় এবং ডায়রিয়া হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত কিছু অস্বাস্থ্যকর অসুস্ত অভ্যাসের কারণে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। যেমনঃ অপরিচ্ছন্ন থাকা, খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত না ধোয়া ইত্যাদি কারণে ডায়রিয়া হতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, ডায়রিয়া রোগটি মূলত পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ।

ডায়রিয়া রোগীর খাবার

ডায়রিয়া হলে রোগীর শরীরে পানি শূন্যতা হয়। তাই এমন খাবার খেতে হবে যাতে শরীর হাইড্রেট থাকে এবং পাকস্থলী খাবারগুলো সহজে হজম করতে পারে। ডায়রিয়া রোগীকে কি ধরনের খাবার দেওয়া যায় সে সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

১। শরীরে লবণের ঘাটতি পূরণ করতে ডাবের পানি অথবা ভাতের মাড় বা চিড়া ভেজানো পানির সাথে হালকা লবণ মিশিয়ে খাওয়াতে হবে।

২। এই সময় নরম ও সহজ পাচ্য খাবার যেমনঃ নরম জাউ ভাত বা সাদা ভাত অথবা মিষ্টি ও চর্বি বিহীন সাদা পাউরুটি খাওয়ানো যেতে পারে।

৩। কাঁচা পেঁপে সিদ্ধ, তেল মসলা বিহীন মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল বা সুপ, টক দই ইত্যাদি উপকারী খাবার খাওয়া যেতে পারে।

৪। অতিরিক্ত তেল মশলা যুক্ত খাবার এবং ভাজাপোড়া খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

৫। অতিরিক্ত চিনি যুক্ত পানীয় এবং চা কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

ডায়রিয়া হলে করণীয় কি

ডায়রিয়া হলে মানুষ ডিহাইড্রেট হয়ে পড়ে। তাই এই সময় রোগীকে খাবার স্যালাইন অথবা ওআরএস স্যালাইন খাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে সেগুলো সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত দেওয়া আছে।

১।খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি সহজে হজম হয় এরকম খাবার যেমন পাকা কলা, সেদ্ধ পেঁপে, ডাবের পানি ইত্যাদি খাওয়াতে হবে।

২।পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে সব নামের হাত থেকে বাঁচাতে রোগীর জামা কাপড় বিছানা আলাদাভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

৩। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত হুট করেই পায়খানা বন্ধ হওয়ার ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। এক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

৪। রোগীর অবস্থা যদি বেশি খারাপ হয় যেমনঃ অনবরত বমি, পায়খানার সাথে রক্ত বের হওয়া, প্রসাব একবারে কমে যাওয়া এরকম অবস্থা দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

মন্তব্য

ডায়রিয়া রোগটি যেহেতু নিজের অসচেতনতার জন্য হয়ে থাকে, তাই এ রোগ থেকে বাঁচতে নিজেকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। লোকজনের মাঝে ডাইরিয়া সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আশা করি এই আর্টিকেল থেকে আপনারা ডাইরিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। তারপরও যদি ডাইরিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত কিছু জানার প্রয়োজন হয় তবে আমাদের কমেন্ট বক্সে প্রশ্ন করুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url